সমাজকে বদলাতে গিয়ে রাজনীতি বদলে গেছে

0
111

বিদ্যমান রাজনীতিকে সংকট বলে মনে করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি আ স ম আবদুর রব। আর তা থেকে উত্তরণের জন্য বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম এই সংগঠক। রাজধানীর উত্তরায় নিজের বাসভবনে বসেই আমাদের সময়ের কাছে তুলে ধরেন বর্তমান ও অতীত রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। কথা বলেছেন ১৯৭১ সালের ২ মার্চ স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের প্রেক্ষাপট নিয়েও।

আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘চলমান রাজনৈতিক ধারার অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। রাজনীতির আত্মঘাতী এমন ধারা অব্যাহত থাকলে জাতি চরম ঝুঁকিতে পড়বে। কেননা অনৈক্য সংঘাত-সংঘর্ষনির্ভর রাজনীতি একটি রাষ্ট্রকে কাক্সিক্ষত উন্নয়নের পথে পরিচালিত করতে পারে না। ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান, গুণগত পরিবর্তন, রাষ্ট্র মেরামতের মৌলিক জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’

কথা প্রসঙ্গে আবদুর রব বলেন, ‘বিশ্ব রাজনীতি এবং বিশ্ব বাস্তবতার নিরিখে টিকে থাকতে হলে এবং স্থিতিশীলতা অর্জন করতে হলে আমাদের অবশ্যই জাতীয় ঐক্য স্থাপন জরুরি। এর মাধ্যমে গণজাগরণ সৃষ্টি করে জাতির নৈতিক শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এ ছাড়া আর এই রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন বা পুনর্নির্মাণ সম্ভব হবে না। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই আমাদের সবাইকে সংকীর্ণতা পরিহার করতে হবে। এটা এখন আমাদের রাজনৈতিক কর্তব্য। এর কোনো বিকল্প নেই।’

আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে পর্যায়ক্রমে জাসদের রাজনীতিতে আসার বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির জনক’ উপাধি দেওয়া জাতীয় এই নেতা বলেন, ‘আমরা সমাজকে বদলাতে চেয়েছিলাম; কিন্তু সমাজ বদলায়নি। ক্রমাগত রাজনীতি বদলে গেছে। আমরা সমাজকে রূপান্তরের রাজনীতি করতে পারিনি। স্বশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের পর সমাজ রূপান্তরের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছিল, তা বিঘ্ন করে ক্ষমতাসীন দল। এখনো তারই ধারাবাহিকতা চলছে।’

তিনি বলেন, ‘চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে শাসনতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে অনেক রক্ত ঝরিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। এখন তারাই আবার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বিশ্বাসের পরিবর্তন জাতীয় রাজনীতিকে দারুণভাবে সংকটগ্রস্ত করে ফেলেছে। দলের আদর্শ কী তারা নিজেরাও জানে না।’

রাজনীতির মাঠে এক সময় চার খলিফার একজন হিসেবে পরিচিত আবদুর রব বলেন, ‘ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করার জন্য আমরা সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথম সুযোগ এসেছিল সেই শাসনব্যবস্থা ছুড়ে ফেলে দেওয়ার; কিন্তু নানা কারণে সদ্যস্বাধীন দেশে আর্থ-রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে রূপান্তরের যে সম্ভাবনা ছিল, তা বিনষ্ট হয়ে গেল। আমরা ‘বিপ্লবী জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম; কিন্তু তখন দলীয় সরকার গঠন করে লৌহকঠিন জাতীয় ঐক্যকে ভেঙে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের সম্ভাবনা ক্ষীণ করে দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা। স্বাধীনতার অর্থ হলো পুরনো বৈষম্যমূলক অমানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অবসান করা। আর বাংলাদেশকে বিনির্মাণ করতে হবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ‘সাম্য’, ‘মানবিক মর্যাদা’ ও ‘সামাজিক সুবিচার’-এর ভিত্তিতে। এই ত্রয়ী আদর্শের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি।”

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম এই নেতা বলেন, ‘মানুষকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম তা পূরণ করতে না পারায় আমরা বরং অভিযুক্ত। আমাদের প্রাপ্তির প্রশ্ন তো আরও পরে। বরং আমরাই আসামির কাঠগড়ায়। রাজনীতির উদ্দেশ্য ছিলÑ সামগ্রিক সমাজব্যবস্থাকে শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা দেওয়া; ভোটের অধিকার, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এখন রাষ্ট্র ক্রমাগত দুর্বৃত্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভোটে বেআইনিভাবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে সরকার রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানকে আইনগত ও নৈতিকভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এ ধারা অব্যাহত রাখলে রাষ্ট্র চরম ঝুঁকির দিকে ধাবিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, শক্তিশালী স্বশাসিত স্থানীয় সরকার গঠন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাসহ কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ নির্মাণই একমাত্র চাওয়া।’

স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী হিসেবে প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছেন কিনা- জানতে চাইলে আ স ম আবদুর রব বলেন, “স্বাধীনতা আন্দোলন বা সংগ্রামে নিজেকে জড়ানোর সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম। এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। স্বীকৃতির প্রশ্নে দেশবাসী জানে। এ বিষয়ে কিছু বলাটা আমার জন্য বিব্রতকর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পতাকা দিবস’-এর অনুষ্ঠান হয়; কিন্তু কোনো নাম উচ্চারণ হয় না। জাতির দুর্ভাগ্য, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাসকে প্রতিমুহূর্তে বিকৃত করা হচ্ছে। আমরা প্রতিদিন শুনি ইতিহাসের নতুন নতুন বয়ান, যা সত্য থেকে অনেক দূরবর্তী।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here