Sunday, May 19, 2024
Homeঅর্থনীতিঅন্ধকার দেখছে আয় বুঝে ব্যয় করা মানুষ

অন্ধকার দেখছে আয় বুঝে ব্যয় করা মানুষ

করোনা মহামারীর তৃতীয় ঢেউ এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু ‘মূল্যস্ফীতির ঢেউ’ দিন দিন বেড়েই চলেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে বাজারে প্রতিদিন কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়ছে। করোনা মহামারী ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে একদিকে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, অন্যদিকে দেশের ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট- দুইয়ে মিলে বেকায়দায় পড়ে গেছে ‘আয় বুঝে ব্যয় করা’ মানুষ।

মূল্যস্ফীতি শুধু এখন বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও গত জানুয়ারির মূল্যস্ফীতি ছিল গত চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির যে হার, তা যৌক্তিক নয়। বিশ্ববাজারের প্রভাবে যতটা না দাম বাড়ে, তার চেয়ে বেশি বাড়ে স্থানীয় বাজারের কারণে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে গড়ে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।

আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড বাংলাদেশ সম্পর্কে তার ‘আর্টিকেল ফোর কনসালটিং’ পর্যবেক্ষণ শেষ করেছে। গত শুক্রবার এটি প্রকাশ করা হয়। আইএমএফ বলেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। মূলত রপ্তানি পুনরুদ্ধার, কোভিড মোকাবিলায় প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন ও সময়োপযোগী মুদ্রানীতি নেওয়ার কারণে এমন প্রবৃদ্ধি হবে বলে মনে করে আইএমএফ।

অর্থনীতির অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশের সামনে এই মুহূর্তে তিনটি ঝুঁকি আছে বলে মনে করে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। এগুলো হলো করোনার অনিশ্চিত গতিপথ, টিকাদানের নিম্নহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ও উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি, আধুনিক নীতি কাঠামো ও বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে বলেছে আইএমএফ। আইএমএফ বলেছে, চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৬ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে।

বাংলাদেশের আর্থিক খাত সম্পর্কে আইএমএফের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা সংক্রমণের গতি বাড়ায় ব্যাংক খাতে ঝুঁকি আরও বেড়েছে। তাই ব্যাংক খাতের তদারকি শক্তিশালী করার পাশাপাশি ‘করপোরেট সুশাসন’ উন্নত করার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। ব্যাংক খাতে বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে আইনি সংস্কারের পরামর্শও দিয়েছে আইএমএফ। এ ছাড়া শেয়ারবাজারের উন্নয়নের সুপারিশও করা হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সুশাসন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার তাগিদও দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, ‘এমনিতেই মূলস্ফীতিতে ঊর্ধ্বগতি ছিল। নতুন করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে এটি আরও গতি পেয়েছে। কারণ জ্বালানির মূল্য বাড়ায় উৎপাদনশীল পণ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে তেল ও গম আমদানিতে খরচ বেড়েছে। এটি সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপ ফেলে।’

তিনি বলেন, ‘যদিও সরকার এটি সমন্বয়ের চেষ্টা করছে। নভেম্বরে যে সমন্বয় করা হয়েছিল, তা আগেই বেড়েছে। ফলে এখন বাজেটে ভর্তুকির মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। আগামী বাজেটের আগে হয়তো জ্বালানির দাম অস্বাভাবিক থাকবে না।’

এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ‘মানুষের আয় এখনো করোনার আগের পরিস্থিতিতে ফেরেনি। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপে কাবু হয়ে পড়েছে মানুষ। এ জন্য মানুষের কষ্ট লাঘবে সরাসরি আর্থিক সহায়তা অথবা ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। যদিও সেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তবে মানুষের জন্য সেটি করতে হবে।’

আসন্ন রমজান মাসে কেউ যেন নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে জন্য কঠোর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি রমজান সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডালের মতো তিন ভোগ্যপণ্য আমদানি বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এই তিন পণ্যের দাম কমে আসার সুযোগ নিতে হবে। এ জন্য দ্রুত এলসি খোলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পেঁয়াজ, ছোলা ও খেজুর আমদানি ও মজুত পরিস্থিতি ভালো অবস্থায় রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম বলছে, বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ খাদ্যপণ্য নিয়ে যে মূল্যস্ফীতির মুখে পড়েছে, তার প্রকৃত চিত্র সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হচ্ছে না। দরিদ্র মানুষের ব্যয়ের বেশির ভাগ খাদ্যের পেছনে যায় বলে তাদের পক্ষে ব্যয় কমানো সম্ভব হয় না।

সানেমের হিসাবে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। নিজস্ব গবেষণার ভিত্তিতে সানেম বলছে, শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী গড়ে তাদের মোট খরচের ৬১ দশমিক ৩১ শতাংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। আর গ্রামীণ প্রান্তিক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা ৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বিবিএস এ ক্ষেত্রে যে হিসাব দেয়, তার তুলনায় এ হার অনেক বেশি। বিবিএসের হিসাবে শহর ও গ্রামের পরিবার তাদের মোট খরচের যথাক্রমে ৪৫ দশমিক ১৭ শতাংশ ও ৫৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। সানেমের প্রাক্কলনে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শহর ও গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক গোষ্ঠীর গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার পাওয়া গেছে যথাক্রমে ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ ও ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে শহর ও গ্রামীণ এলাকার জন্য এ হার ছিল যথাক্রমে ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ ও ১১ দশমিক ২১ শতাংশ।

অবশ্য সানেমের মূল্যস্ফীতির এমন পরিসংখ্যান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ৩ মার্চ বলেন, ‘সরকার সব নিয়ম মেনেই মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করছে। তাদের (সানেমের) কাছে আমার প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিয়মনীতি অমান্য করেছি? প্রত্যেক দেশ যেভাবে মূল্যস্ফীতির হিসাব করছে, আমরাও সেভাবে করছি। উনারা মূল্যস্ফীতির যে তথ্য পেয়েছে, উনারা সেটা ব্যবহার করুক। আমি কারও বিরুদ্ধে বলব না। সরকার থেকে যে কাজগুলো করা হচ্ছে, সেখানে কোনো ব্যত্যয় নেই। উনারা প্রতিদিনই ইনফ্লেশন বের করতে পারেন, সেটা উনারা করুক। উনারা কীভাবে করে আমি জানি না। উনারা কি ইন্ডিয়ার ডেটা ব্যবহার করে, নাকি রাশিয়ার ডাটা ব্যবহার করে? নাকি ফ্রান্সের ডাটা ইউজ করে আমি জানি না। আমাদের ডাটা তো আমাদের কাছেই আছে।’

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular