Thursday, April 18, 2024
Homeবিশ্বউসকে দিয়ে উত্তরণে উদাসীন পশ্চিম

উসকে দিয়ে উত্তরণে উদাসীন পশ্চিম

এ যেন ভরসা করে ভড়কে যাওয়া। চোখে সরষে ফুল দেখার মতো অবস্থা ইউক্রেনের। রণে তো নয়-ই, উত্তরণেও যেন দেশটির প্রতি উদাসীনতা দেখাচ্ছে পশ্চিমাবিশ^- বিশেষত দুই মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। যুদ্ধের পর ইউক্রেনে সেনা পাঠানো, উড়ান-নিষিদ্ধ আকাশ ঘোষণা এবং রাশিয়ার থেকে তেল কেনায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান- ‘সাত-পাঁচ ভেবে’ কিয়েভের কোনো কথায় কান দিচ্ছে না ওয়াশিংটন ও লন্ডন। কৌতুক অভিনেতা থেকে রাষ্ট্রনেতা, যুদ্ধাক্রান্ত প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অবশ্য ‘লড়াই করে মাতৃভূমি রক্ষা’র প্রত্যয়ে এখনো পর্যন্ত ‘অদম্য’, কিন্তু তার সরকারের ‘অস্ত্র সমর্পণ’ ছাড়া রাশিয়া এ যুদ্ধে ক্ষ্যান্তি দেবে কিনা, সন্দেহ রয়েছে।

পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটোয় ইউক্রেনের কাক্সিক্ষত সদস্যপদকে ঘিরে যে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকি’ অনুভব করছিল রাশিয়া,তা মোকাবিলার নামে দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পর ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক হামলা শুরু করে রুশবাহিনী। একাধিক শহর আক্রমণকারী বাহিনীর দখলে, লাখ পনের ইউক্রেনীয় দেশ ছাড়া।

ইউক্রেন বলছে, হাসপাতাল ও শিক্ষালয়ে হামলা হচ্ছে, যদিও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে রাশিয়া বলছে ‘নব্য-নাৎসিদের’ বিরুদ্ধে এ এক ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’। জাতিসংঘ জানিয়েছে, প্রথম নয় দিনে সাড়ে তিনশ সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে; এ তথ্য অবশ্য রাশিয়ার দাবিকেই সমর্থন দেয়।

এদিকে, এ অভিযানে সর্বাধুনিক ও শক্তিশালী বিমান বাহিনীকে ব্যবহার না করায় রুশ প্রেসিডেন্টের রণকৌশল যুদ্ধ-বিশ্লেষকদের ভালোই ভাবাচ্ছে। অবশ্য পশ্চিমা দেশগুলো এবং তাদের গণমাধ্যমগুলো একে ভøাদিমির পুতিনের ‘ধীর অগ্রগতি’ এমনকি ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করছে। এ রকম নানাভাবে যুদ্ধ শুরুর আগে ও পরে আগুন উসকে দিচ্ছে পশ্চিমা বিশ^। একটি মাত্র নাম বললে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্র।

যেমনটা বলেছেন স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রেরই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিরশিমার। তার ভাষায়, ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া যে রাশিয়া সামরিক অভিযানে অধিগ্রহণ করেছিল, সেই দায়ের বেশিরভাগই যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও এর ইউরোপীয় মিত্রদের, এবারও ইউক্রেনে চলমান রুশ আগ্রাসনের নেপথ্যে ‘উসকাঠি’ (আগুন উকানি) হলো যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন গণমাধ্যম নিউ ইয়র্কারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি তিনি এ কথা বলেছেন।

মিরশিমারের গবেষণার কেন্দ্র হলো মার্কিন বিদেশনীতি। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে যা করে, এতে বরং বহিঃশত্রু বাড়ে। ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ ঠিক সে কারণেই রাশিয়াকে ‘প্রতিপক্ষ’ হতে একরকম বাধ্য করেছে।

মিরশিমার নিউ ইয়র্কারকে বলেছেন, ‘ইউক্রেন যদি আমেরিকাপন্থি মুক্ত গণতন্ত্র হয়, যদি পায় ন্যাটোর সদস্যপদ, আর পায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ, রাশিয়া অবশ্যই তা মেনে নেবে না। যদি ন্যাটোর সম্প্রসারণ না হতো, না হতো ইইউর সম্প্রসারণ, ইউক্রেন যদি কেবলই একটি মুক্ত গণতন্ত্র হতো এবং যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের সঙ্গে আর দশটা গণতন্ত্রের মতো বন্ধুত্ব থাকত, তা হলে এ যুদ্ধ বাধত না।’

মস্কোও একই কথা বলেছে বহুবার। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ থামাও- এ কথা বলতে বলতে তিনি মুখের ফেনা তুলে ফেলেছেন, অথচ কথাটা কেউ (যেমন যুক্তরাষ্ট্র) কানে তোলেনি। উল্টো, ২০২৪ সাল নাগাদ কিয়েভকে ক্লাবে নেওয়ার ইঙ্গিত ছিল ন্যাটোর নানান আলাপে। কিয়েভের সরকারও সে আশায় নেচেছে এতদিন। যুদ্ধ বাধার পর অবশ্য বোধোদয় হয়েছে জেলেনস্কির, ‘ইউক্রেনকে একা ছেড়ে দিয়েছে’ সবাই।

রণে সরাসরি সেনা পাঠানোর যে আহ্বান জানিয়েছেন জেলেনস্কি, তা অবশ্য ন্যাটো পারে না। কারণ, ইউক্রেন সদস্য নয়। কিন্তু গতকাল দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার জন্য যে আহ্বান জানিয়েছে কিয়েভ, তা নাকচ করে ওয়াশিংটন বলছে, তারা রাশিয়া থেকে তেল কিনবেই। ওদিকে, রুশ তেলে নিষেধাজ্ঞায় সবচেয়ে বিপর্যস্ত হবে জার্মানি ও ইতালি। ফলে, ‘আপনা আপনা’ হিসেব বুঝেই তবে রাশিয়াবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে ইউক্রেনের এতদিনের কথিত মিত্ররা। যেমন, ইউক্রেনে ‘উড়ান-নিষিদ্ধ আকাশ’ ঘোষণার আহ্বান ফিরিয়ে দিয়ে ওয়াশিংটন বলছে, তবে তো তৃতীয় বিশ^যুদ্ধ বেঁধে যাবে, এমন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র চায় না।

শরণার্থী বিষয়েও একই অবন্ধুতার মুখোমুখি ইউক্রেন। ১৫ লাখ ইউক্রেনীয় এরই মধ্যে দেশ ছেড়েছে। এদের মধ্যে প্রতিবেশী পোল্যান্ডেই প্রায় ১০ লাখ আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু কঠোরতার আভাস মিলছে যুক্তরাজ্যের কথায়। এ পর্যন্ত পঞ্চাশ জনের কিছু বেশি ইউক্রেনীয়কে জায়গা দিয়েছে লন্ডন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশ্রয় দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও কাউকেই যাচাই না করে ভিসা দেবে না ব্রিটিশ প্রশাসন।

অথচ, যুদ্ধ থেকে বাঁচতে চাওয়া ইউক্রেনীয়দের উদ্ধারে ‘মানবিক পথ’ এমনকি আক্রমণকারী দেশ রাশিয়াই প্রস্তাব করেছে। মস্কো বলছে, যারা দেশ ইউক্রেন ছাড়তে চায়, তারা হয় বেলারুশ (কিয়েভের চোখে এ দেশটি হলো রাশিয়ার দোসর) নয়তো রাশিয়া যাক। এমন প্রস্তাবকে ইউক্রেন বলেছে, ‘অসম্ভব অনৈতিক’, আর যুক্তরাজ্য বলছে, ‘কল্পনাতীত নিষ্ঠুর’। আবার, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি জানিয়েছে, যে পথে উদ্বাস্তুদের উদ্ধার করা হবে, সে পথে পোঁতা রয়েছে বিস্ফোরক। আবার, ইউক্রেন ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে।

সিএনএন জানিয়েছে, জেলেনস্কি গতকাল তার নাগরিকেদের যুদ্ধ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, ইউক্রেন নিজেই লড়াই করে দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমি রক্ষা করবে। আর হামলার জন্য রুশদের কখনো ভোলা হবে না, ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঙ্কার দিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘মানুষ হত্যার বদলা নিবই নিব। এ হামলার কথা ভুলব না। ক্ষমাও করব না। এমনকি ঈশ^রও ক্ষমা করবেন না।’

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular