হচ্ছে দুর্ধর্ষ ছিনতাই, পুলিশ নিচ্ছে হারানোর জিডি

0
32

১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা। জরুরি হওয়ায় সড়কে রিকশায় বসেই মোবাইল ফোনে একটি জুম মিটিংয়ে যুক্ত ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা সমীর কুমার। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিকল্পনা কমিশনের সামনে পৌঁছামাত্র মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক ছোঁ মেরে তার ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

গত ১ জুন ওই এলাকা থেকেই ছিনতাই হয় পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের মোবাইল ফোন। হতভম্ব সমীর শেরেবাংলানগর থানায় গেলে মোবাইল ফোন হারানোর জিডি নেওয়া হয়। জিডিতে লেখা হয়, ‘পরিকল্পনা কমিশনের পশ্চিম পাশের রাস্তা থেকে মোবাইলটি হারিয়ে যায়।’

শুধু সমীর কুমার নয়, রাজধানীতে ভয়াবহ ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে থানায় যাওয়ার পর অনেকের বেলায়ই ‘চুরি’ কিংবা ‘হারিয়ে যাওয়ার’ অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে পুলিশ। ফলে ছিনতাইয়ের ঘটনা আড়ালে চলে যায়। ডাকাতি-ছিনতাইয়ের বড় অপরাধ হয়ে যায় মামুলি চুরি কিংবা হারানোর জিডি। অপরাধ কমিয়ে রাখায় পারদর্শী চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে সুনাম বাড়ে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিসহ কর্মকর্তাদের। হারানো ও জিডির ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি না থাকায় ছিনতাইয়ের মালামাল উদ্ধারের নজির খুবই কম। যে কারণে ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যায়ও না অধিকাংশ ভুক্তভোগী। কেমলমাত্র ছিনতাইকারীদের গুলি কিংবা ছুরিকাঘাতে হতাহত হলে কিছু ঘটনা প্রকাশ্যে আসে বলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে।

ছিনতাইয়ের ঘটনায় ‘হারিয়ে যাওয়ার’ জিডি করার ব্যাপারে জানতে চাইলে সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি সমীর কুমার। তবে পরে আমাদের সময়কে বলেন, ডিউটি অফিসার যেভাবে বলছেন তিনি সেভাবেই অভিযোগ দিয়েছেন। জীবনে প্রথম এমন ঘটনার মুখোমুখি হওয়ায় বিষয়টি প্রথমে বুঝতেই পারেননি। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে, দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও।

গত ১৪ ডিসেম্বর বেলা পৌনে ২টায় পল্লবীর ১০ নম্বর সেকশনে স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশনের সামনে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিনতাইয়ের শিকার হন। ছিনতাইকারীরা তার ওয়াকিটকি, সঙ্গে থাকা বোনের ১১ লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, তার মোট ১২ লাখ ৩৩ হাজার টাকার সম্পদ ছিনতাই হয়েছে। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে ওয়াকিটকিসহ বিপুল অঙ্কের টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনাটি এত দিন জনসম্মুখে না এলেও বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অভ্যন্তরেও তোলপাড় হয়। ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম ছিনতাইকারী ধরতে কঠোর নির্দেশনা দেন। ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না নিলে ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুশিয়ারি দেন।

১৪ ডিসেম্বর পুলিশের ওয়াকিটকি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৬ ডিসেম্বর সকালে পল্লবী থানায় একটি মামলা হয়। পল্লবী থানার এসআই সাইফুল ইসলাম বলেন, ছিনতাই হওয়া মালামাল ও টাকা উদ্ধার হয়নি। তবে মামলাটি এখন ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবি কর্মকর্তারা তদন্ত করছেন।

ভুক্তভোগী ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, গত মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ৫টি। তবে মামলার রেকর্ড থেকে প্রকৃত ডাকাতি-ছিনতাইয়ের তথ্যের স্পষ্ট ধারণা মেলে না। কারণ অধিকাংশ এলাকায় থানাপুলিশ ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা নিতে চায় না। এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো দেখাতে ছিনতাইয়ের শিকার ভুক্তভোগী থানায় গেলেও মালপত্র হারানোর জিডি নথিভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ডিএমপির গত দুই মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভা থেকে ছিনতাই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ঢাকার ৫০ থানার ওসি এবং সব ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সদস্যদের আরও তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। টহল পুলিশ যাতে তৎপর থাকে, সেজন্য তদারকি কর্মকর্তাদের তৎপরতা বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। পুলিশের টহলে কোনো ধরনের গাফিলতি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম।

ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পুলি, ছিনতাইয়ের মামলা নিতে চায় না। অথচ মামলা নেওয়ার জন্যই সরকার আমাদের ভেতন-ভাতা দিচ্ছে। কেউ মিথ্যা মামলা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, মামলা, জিডি, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স কিংবা যে কোনো সেবা নিতে গিয়েছে, এমন ১ লাখ ৮০ হাজার ব্যক্তিকে ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে ফোন করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর মামলা না নেওয়া, থানায় সেবা না পেয়ে ফিরে আসার কারণে এসআই থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার শতাধিক কর্মকর্তাকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাঁচটি কারণে মূলত ছিনতাইয়ের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে- মাদকসেবীর সংখ্যা বৃদ্ধি, টহল পুলিশের তৎপরতার অভাব, করোনায় বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া, ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারে পুলিশের ব্যর্থতা এবং গ্রেপ্তার হওয়া ছিনতাইকারীদের দ্রুত জামিনে এসে আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়া। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারাও ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে এসব বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন।

ডিএমপিতে দায়ের হওয়া ছিনতাইয়ের মামলার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২১ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয় ১৪৫টি, ২০২০ সালে ছিল ১৭৬টি, ২০১৯ সালে ১৫৫টি, ২০১৮ সালে ২১৬টি ও ২০১৭ সালে মামলা হয় ২১৮টি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ছিনতাইকারীদের অন্তত ৯০ শতাংশ মাদকাসক্ত। মাদকের টাকা জোগাতেই তারা ছিনতাই করে। মাঝে মাঝে এসব ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করলেও দ্রুত তারা জামিনে বেরিয়ে আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ছিনতাইকারীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ছিনতাইকারীদের একটি বড় অংশ স্থানীয় থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে রাজনৈতিক দলের কর্মী। এ ছাড়া রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের ৭-৮টি গ্রুপ পার্শ্ববর্তী সাভার, গাজীপুর, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে ভোরে কিংবা সন্ধ্যায় শহরে এসে ছিনতাই করে পালিয়ে যায়। একবার ছিনতাই করার পর তারা কয়েক দিন আর ঢাকায় আসে না। ফলে তাদের গ্রেপ্তারও করা যায় না।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দিন-রাত ভাগ করে রাজধানীর তিন শতাধিক স্থানে চলে ছিনতাই-ডাকাতি। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ছিনতাইকারীরা মতিঝিলের ব্যাংকপাড়াসহ বাণিজ্যিক এলাকাগুলো বেছে নেয়। বিকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ছিনতাইকারীরা ছড়িয়ে পড়ে অলিগলি ও নীরব রাজপথে। টার্গেট তাদের পথচারী। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের আশপাশে ওঁৎ পেতে থাকে ছিনতাইকারীরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএমপির একটি থানার ওসি বলেন, রাজধানীর অধিকাংশ স্থানেই সিসি ক্যামেরা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তদারকি ও মেরামত না করায় এসব সিসি ক্যামেরার বড় অংশই কাজে আসে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here