ঢাবির নির্বাহী প্রকৌশলীর চাকরি নিয়ে প্রশ্ন

0
65

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুল কবির মল্লিক চাকরিতে যোগদানের সময় সনদ জালিয়াতি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের শর্ত মানেননি তিনি।

এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের প্রটোকল অফিসার (পিও) ছিলেন। নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠার পর তাকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ভিসি আখতারুজ্জামান বলেন, তথ্য গোপন করে থাকলে মল্লিক অন্যায় করেছেন। তবে মল্লিক তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০১৩ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন আহসানুল কবির মল্লিক। পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অভিযোগ রয়েছে-২০১২ সালে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) হিসেবে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের অধীন বিদ্যুৎ বিভাগে যোগ দেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রার্থীকে সরকার অনুমোদিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমপক্ষে দ্বিতীয় বিভাগে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং (ইলেকট্রিক্যাল) পাস হতে হবে এবং সরকারি/আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে তিন বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতাসহ কম্পিউটারের ওপর দক্ষতা থাকতে হবে; কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতার যে সনদ দেখিয়ে তিনি চাকরি নেন, তাতে দেখা যায় তিনি চার বছরমেয়াদি বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং করেননি। পলিটেকনিক্যাল কলেজ থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর তিন বছরমেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স করেন। পরে তিনি তার অধ্যয়নরত কলেজ থেকে অনুমতি নিয়ে ইন্সট্রাক্টর হিসেবে কাজ করার জন্য ওআইসি পরিচালিত ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে দুই বছরমেয়াদি বিএসসি ইন টেকনিক্যাল এডুকেশন কোর্স করেন, যা বিএডের মতোই একটা কোর্স। তবে নিয়োগের সময় তিনি নিজেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দেখিয়েছেন।

তার অভিজ্ঞতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে সরকারি/আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে তিন বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা চাইলেও জানা গেছে তিনি খুলনা টেকনিক্যালে ইন্সট্রাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। এমনকি কম্পিউটারের ওপরও তার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। সর্বোপরি যে সেকশনে যোগ দেন সে বিষয়ে তার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই; কিন্তু তিনি প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ উপায়ে নিয়োগ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, ভিসির প্রভাব খাটিয়ে শর্ত পূরণ না করেই পদোন্নতি পেয়েছেন আহসানুল কবির মল্লিক। এই বিভাগে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত স্নাতক প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা এবং ডিপ্লোমা পরীক্ষা পাস সহকারী প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট চাকরিকাল ১৫ বছর। তন্মধ্যে সাত বছর সহকারী প্রকৌশলীর চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে; কিন্তু পদোন্নতির যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রভাব খাটিয়ে তিনি পদোন্নতি লাভ করেন।

রেজিস্ট্রার ভবন সূত্র জানায়, আহসানুল কবির মল্লিক যোগদানের পর থেকেই নানা ধরনের অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের এলাকায় তার বাড়ি এবং তার প্রিয়ভাজন হওয়ায় নিজেকে উপাচার্যের কাছের লোক বলে পরিচয় দিয়ে রেজিস্ট্রার ভবনের প্রকৌশল দপ্তরের এক কর্মকর্তার সঙ্গে মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে লাখ লাখ টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের প্রটোকল অফিসার থাকাকালে প্রভাব খাটিয়ে তিনি এসব অনিয়ম করেন। এ কারণে তাকে পিও পদ থেকে সরিয়ে পুনরায় বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হয়। নিজ বিভাগে ফিরে আসার পরও তিনি এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি প্রভাব খাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত বাসাও নিয়েছেন।

নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা হলে এক ভুক্তভোগী জানান, তার এক আত্মীয়ের চাকরির জন্য আহসানুল কবির মল্লিক তার থেকে বেশ কয়েক লাখ টাকা নিলেও তার ওই আত্মীয়ের চাকরি হয়নি। অথচ তার ওই আত্মীয় নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। এর পরও চাকরি হয়নি। আরেক ভুক্তভোগী জানান, তার এক আত্মীয়র নিয়োগের ক্ষেত্রে টাকা নিয়েছেন আহসানুল কবির মল্লিক।

অভিযোগের বিষয়ে আহসানুল কবির মল্লিক বলেন, আমার নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। যথাযথ প্রক্রিয়ায় আমি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন করি এবং নিয়োগ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হই। এর পর নিয়োগ হয়। এ সময় তিনি সনদের বিষয়টি এড়িয়ে যান। নিয়োগ বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত নই। কেননা আমার এমন কোনো সাইনিং পাওয়ার নেই যে, আমি নিয়োগ দিতে পারব। অভিজ্ঞতার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার যথাযথ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর আগে আমি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছি।

বাসার বিষয়ে আহসানুল কবির বলেন, আমার আগেও ওই বাসায় এক কর্মকর্তা থাকতেন। প্রভাব খাটিয়ে যে আমি ওই বাসায় থাকি, এই অভিযোগ সঠিক নয়।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, আহসানুল কবির মল্লিককে তো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দিয়েছিল। তথ্য গোপন করে চাকরি নিয়েছিল কিনা আমি সঠিক জানি না। বিজ্ঞপ্তিতে যা-ই থাকুক, তিনি যদি তার যা যোগ্যতা আছে তা দিয়ে আবেদন করেন আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়ে নেয়, তা হলে তো তার কোনো দোষ নেই। আর সে যদি তথ্য গোপন করে চাকরি নিয়ে থাকেন তা হলে তিনি অন্যায় করেছেন। তথ্য গোপন করেছিলেন কিনা খোঁজ নিয়ে দেখব।

শিক্ষকদের বাসা তিনি কীভাবে পেয়েছেন তা জানেন না উপাচার্য। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হয়তো দিয়েছে। জোর করে তো ওঠা সম্ভব নয় ওই বাসায়। আর নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে তার কাছে কেউ অভিযোগ করেনি বলে জানান ভিসি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here