জীবন চলছে ধারদেনা আর খরচ কাটছাঁটে

0
68

দ্রব্যমূল্যের চাপে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন মৌলিক খরচের খাতায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে। পারিবারিক ব্যয় সংকোচন করে অনেকেই টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। মানুষের মৌলিক অধিকার অন্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা- সব খাতেই প্রয়োজনীয় খরচের বোঝা বইতে না পেরে মানুষ খরচ কমানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। মধ্যবিত্তরা বোবা হয়ে গেছেন। নিম্নমধ্যবিত্তরা টিসিবির পণ্যের জন্য দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াচ্ছেন। আর স্বল্পআয়ের মানুষের দুঃখ এখন সীমাহীন।

মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকার কার্ডের মাধ্যমে টিসিবির পণ্য দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানেও কালো হাতের থাবা। স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম। সামাল দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় অর্থনীতি বিশ্লেষকরা দেশের মূল্যস্ফীতির বিষয়টিকে সামনে আনছেন।

তারা বলছেন, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধিতে কষ্টে আছেন দেশের মানুষ। দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন তারা। মূল্যস্ফীতি দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিচ্ছে। নতুন করে অনেককে দারিদ্র্যের খাতায় নাম লিখিয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ যেমন সামলানো যাচ্ছে না, তেমনি নিত্যপণ্যের দামেও লাগাম টানা যাচ্ছে না। কয়েক মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের আশপাশে আটকে ছিল, সেটি ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। মজুরি সূচক ও মূল্যস্ফীতি প্রায় কাছাকাছি চলে আসছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ফেব্রুয়ারি শেষে দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১৭। এর মানে হলো- গত বছর ফেব্রুয়ারিতে যে পণ্য ১০০ টাকায় মিলত, সেটি এখন ১০৬ টাকা ১৭ পয়সায় কিনতে হচ্ছে। জানুয়ারিতে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৬ দশমিক ২২ হয়েছে, যা আগের মাসে ছিল ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। অবশ্য খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ১০-এ নেমেছে, যেটি জানুয়ারিতে ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল।

এদিকে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের (সিপিজে) এক জরিপে দেখা গেছে, করোনাকালের আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে টিকে থাকতে খাবারের ব্যয় কমিয়েছে বড় অংশের মানুষ। সর্বশেষ এ হার দাঁড়িয়েছে ৪৩ শতাংশে। এর বাইরে কেউ কেউ সঞ্চয় ভেঙে চলছেন। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কোনো রকমের দরকষাকষি ছাড়াই নিম্ন মজুরির কাজে যোগ দিয়েছেন। ২০২০ সালের জুনে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) জানায়, করোনার প্রভাবে দেশে নতুন করে ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) যৌথ জরিপের তথ্যে বলা হয়েছিল, দেশে করোনাকালে ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। এ জরিপের ফল প্রকাশ করা হয় গত বছরের নভেম্বরে।

এর আগে গত বছরের জানুয়ারিতে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) জানিয়েছিল, করোনার প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার (আপার পোভার্টি রেট) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ, যা করোনার আগে ২১ শতাংশের মতো ছিল। যদিও সরকার নতুন দরিদ্রের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে।

শুধু দরিদ্র ও হতদরিদ্ররাই নয়, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যস্ফীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরাও। বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট। নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের আমিষজাতীয় খাবার কেনা অনেকটা কমিয়ে দিতে হয়েছে। এতে তাদের পরিবারে, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের পুষ্টির অভাব দেখা দিচ্ছে। এতে অবনতি ঘটছে তাদের স্বাস্থ্যের। তা ছাড়া এসব পরিবারকে কমিয়ে দিতে হচ্ছে শিক্ষা খাতে ব্যয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থী। সংকোচন করতে হচ্ছে পরিবারের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই খাদ্যের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের কাছে বড় কষ্টের।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোভিডের মধ্যে বিশ্বের অনেক দেশের মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সমস্যা হলো মূল্যস্ফীতি সংখ্যায় যা বলা হয়, ধারণায় তার অনেক বেশি। এ কারণে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। টিসিবির ট্রাকের সামনে মানুষের সারি দেখলেই বাস্তব চিত্র বোঝা যায়। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের তুলনায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে যখন ব্যবসা-বাণিজ্যসহ পুরো অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে মূল্যস্ফীতি। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করার এই প্রক্রিয়ায় মজুরিও বাড়ে। কিন্তু সেই বাড়তি মজুরির টাকা খেয়ে ফেলছে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। এখন মূল্যস্ফীতির হার জাতীয় পর্যায়ে মজুরি বৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে। সাধারণত মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির কিছুটা বেশি থাকে। অর্থনীতির সেই চিরায়ত প্রবণতায় উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মজুরিও বাড়ে। মজুরি বেশি বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতির আঁচ টের পান না তারা। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হলে মানুষের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। এখন বাংলাদেশে তাই হয়েছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যও তাই বলছে।

অর্থাৎ এখন দেশের দিনমজুর-শ্রমিকরা যা উপার্জন করছেন বা যা মজুরি পাচ্ছেন, তা দিয়ে তাদের সংসার চলছে না। হয় ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে, না হয় অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য কম কিনছেন বা কম খাচ্ছেন, সঞ্চয় করা বা জীবনযাত্রার বাড়তি চাহিদা মেটানো তো দূরে থাক।

করোনা মহামারীর মধ্যে ২০২০ সালের জুন মাসে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম ছিল। ওই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। গত এক দশকের মধ্যে সেটিই ছিল ব্যতিক্রম ঘটনা। আবার সেই ব্যতিক্রম আবার ঘটেছে গত ফেব্রুয়ারিতে।

বিবিএস সোমবার মূল্যস্ফীতি ও মজুরি সূচকের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায় ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর মজুরি বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি এই তথ্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, দেশের মানুষ কষ্টে আছেন। দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন তারা। সাধারণত মূল্যস্ফীতি ও মজুরি হার বৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্য ১ শতাংশের মতো হয়। কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এখন তা ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু মজুরি সেই হারে বাড়ছে না। নভেম্বর, ডিসেম্বরে ও জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ও মজুরি সূচক প্রায় সমান্তরালে চলেছে। ফেব্রুয়ারিতে এসে মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে মূল্যস্ফীতি।

গত নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আর মজুরি বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। আর মজুরি বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ১১ শতাংশ। জানুয়ারিতে মজুরি হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

যদিও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের দাবি, দেশে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হার বিবিএসের দ্বিগুণের চেয়ে বেশি। গত ৩ মার্চ ‘মূল্যস্ফীতি : সরকারি পরিসংখ্যান বনাম প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সানেম। এতে বলা হয়েছে, শহর এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার এখন ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর গ্রামে এই হার ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘পণ্যমূল্য নিয়ে সরকারি সংস্থা বিবিএস যে তথ্য দিচ্ছে, তা বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ ক্ষেত্রে যদি সঠিক তথ্য তুলে আনা না হয়, তবে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া টেকসই হবে না। নানা তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিবিএস পুরনো ভিত্তি বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হিসাব করছে, যা বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না। সেলিম রায়হান বলেন, ‘নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ খুবই কষ্টে আছে। ভাত না খেয়ে অন্য কিছু খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছে অনেক মানুষ।

ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে দ্রব্যমূল্যসংক্রান্ত এক প্রশ্নে বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আশপাশের দেশের তুলনায় আমাদের মূল্যস্ফীতি অনেক কম।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, আপনি (সাংবাদিক) আমার জায়গায় হলে কী করতেন? আপনি যা করতেন আমি তাই করব। ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ হবে সেটি কি কখনো ভেবেছি আমরা। অর্থনীতি এমনই। যেমনি সারটেইন সিচুয়েশন আছে, তেমনি আনসারটেইন সিচুয়েশনও আছে। চ্যালেঞ্জিং এরিয়াগুলো যখন যেটি সামনে আসবে, তখন কীভাবে তা মোকাবিলা করব সে ধরনের পথ তৈরি করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here