আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে বদলে গেছে জীবন

0
71

রাজশাহীর গোদাগারী উপজেলার ৬ নম্বর মাটিকাটা ইউনিয়নের কাদিপুর গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে কয়েকটি ঘর। ভরদুপুর; গ্রীষ্মের প্রখর তাপ; সবাই যার যার ঘরের ছায়ায় বসে কাজ করছেন কিংবা বিশ্রাম নিচ্ছেন। একটি ঘরে তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে কয়েক তরুণ-তরুণী কী যেন এক কর্মযজ্ঞ নিয়ে ব্যস্ত! ঘরের সামনে নির্মাণ করা হচ্ছে মঞ্চ, টাঙানো হচ্ছে নান্দনিক শামিয়ানা। চলছে আলোকসজ্জার প্রস্তুতিও। কথা বলে জানা গেল, এসব বিয়ের প্রস্তুতি; সমীর দাস ও সিন্ধু দাসের মেয়ে নূপুরের রাতেই (গতকাল বৃহস্পতিবার) বিয়ে হবে।

সমীর দাসের পরিবারে বিয়ে অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে বিয়ে ঘিরে যে আনন্দ, তার আবির্ভাব খুব বেশি দিন আগের নয়। বছর দুয়েক আগেও এই সমীর দাস ও সিন্ধু দাস দম্পতির জীবনগল্পের গতিপথ এগোচ্ছিল ভাঙনের স্রোত ধরে। নদী ভাঙনে ভিটেমাটিও হারান তারা। পরে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে জায়গাসহ একটি ঘর পান সমীর দাস। এরপরেই বদলে যায় তাদের জীবন-বাস্তবতা। নিজস্ব আবাস নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি পালন শুরু করেন বাড়ির নারী সদস্যরা। আর ভ্যান চালিয়ে আয়-রোজগার করেন সমীর দাস।

সংসারের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে সিন্ধু দাস বলেন, ‘অনেক কিছুই হয়েছে। নয়তো এতগুলো মানুষ চলছি কী করে!’ আগের মেয়ের বিয়েতে এমন আয়োজন ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তখন কী আর আমাদের জীবন ছিল গো!’

গোদাগারী উপজেলার এই কাদিপুর গ্রামে ৩৭টি ঘর রয়েছে। ৩টি ঘরে আছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবার। ৩৪টি ঘরে আছে মুসলিম পরিবার। এদের সবাই নদী ভাঙনের শিকার।

গোদাগারী উপজেলার গোগ্রাম ইউনিয়নের রানীনগর গড়বাড়ি গ্রামে আরেক আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে রয়েছে ৬৫টি বাড়ি। দ্বিতীয় ধাপের ৬০টি আর তৃতীয় ধাপে ৫টি। গড়বাড়ি আশ্রয়ণের প্রবেশ পথের বাঁ পাশে জুলেখা বেগমের ঘর। ঘরের বারান্দায় নিয়ে বসেছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। অর্থাৎ ছোট্ট মুদি দোকান। ৬৫টি বাড়ির প্রায় সবাই এখান থেকে কেনাকাটা করেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী জুলেখা বেগমের ছেলে আবদুল হাদীও তার পাসের বাড়িটি পেয়েছেন। এলপি গ্যাসের চুলায় তিনি চা বানিয়ে তার ঘরের বারান্দায় বিক্রি করেন। আর দিনের একটা সময়ে চালান অটোরিকশা। বাসায় টিভি, ফ্যান ও ডিসলাইন রয়েছে।

জুলেখা বেগমের ভাষ্য, ‘শেখ হাসিনা সরকার ভালোবাইস্যা দিয়েছে, তাই লবণ-তেলের পয়সা (জীবন চালানোর ব্যবস্থা) হয়েছে।’ তার স্বামী আশবাউল ইসলাম বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী আলীপুরের জায়গা নদীতে ভেসে যাওয়ায় আমরা এখানে আশ্রয় নেই। পরে সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্প করায় পাকাঘরে ওঠার সুযোগ হয়। নিজের আধাপাকা বাড়ি হয়েছে। বিদ্যুতের আলো আর পাখার বাতাসে ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে আছি, এটা কম কিসের।’

৪০ বছর বয়সী শরিফুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘এই ঘর পাওয়ায় বছর বছর ঘর সংস্কারের খরচ বেঁচে গেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বাড়ির নিরাপত্তা।’ তিনি ৪টি গরু লালনের পাশাপাশি কৃষিকাজ করেন। আর স্ত্রী হানুকা খাতুন করেন সেলাইয়ের কাজ। ফলে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে তাদের কিছু সঞ্চয় থাকে বলেও জানান শরিফুল।

এখানকার সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়েছে রানীগড়ের তৈয়ব আলীকে। একবার সব শেষ হয়েছিল নদী ভাঙনে। পরে বাবা-ছেলে মিলে কিছু আয় করে মালদ্বীপ যাওয়া স্বপ্ন দেখেছিলেন; গিয়েছিলেনও। কিন্তু পর্যটক ভিসায় পাঠানোয় সপ্তাহখানেকের মধ্যে নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসতে হয়। অন্তহীন হতাশা নিয়ে শুরু হয় আরেক জটিল জীবন। পরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি পেয়ে আমূল বদলে যায় তৈয়ব আলীর জীবন। তিনি সেখানে তার বরাদ্দকৃত জায়গায় এবং বাইরে আরেকটু জায়গা নিয়ে তিনটি মহিষ, একটি গরু ও দুটি ভেড়া পালেন। খড় কাটার মেশিনও আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here