দলীয় ও সচ্ছলরা পাচ্ছে টিসিবি ফ্যামিলি কার্ড

0
142

মুরাদ হোসেন লিটন : অসচ্ছল ও গরিব মানুষের আর্থিক কষ্ট লাঘবে ন্যায্যমূল্যে টিসিবি পণ্য দিতে এক কোটি কার্ড বিতরণ করেছে সরকার। কিন্তু বাস্তবে মাঠপর্যায়ে কী হচ্ছে? কারা পাচ্ছে টিসিবির পণ্যসুবিধা? কারা পেয়েছে কার্ড? সকাল থেকে লাইনে দাঁড়ানো সেই অভাবী মানুষের ঘরে কি যাচ্ছে পণ্যসুবিধা? আমাদের সময়ের পক্ষ থেকে কয়েকটি জেলায় সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ঠাঁকুরগাওয়ে টিসিবির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পেয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও সচ্ছল ব্যক্তিরা। বগুড়ায় কার্ড বিতরণে হয়েছে দলীয়করণ, পণ্য বিক্রিতে হচ্ছে অনিয়ম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিশেষ সুবিধাভোগীরা রয়েছেন তালিকায়।

আমাদের সময়ের আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত-

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কার্ড পেয়েছেন অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান। ৪ নম্বর ওয়ার্ডে পেয়েছেন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ারা চৌধুরী, যিনি একটি এনজিওর পরিচালকও। বহুতল ভবনও রয়েছে তার। একই ওয়ার্ডে কার্ড পেয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজাদের স্ত্রীও। আওয়ামী লীগ নেতার ভাই ও বহুতল ভবনের মালিক আনছারুল হকও কার্ড পেয়েছেন। আনছারুল হক চিনিকলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এই ওয়ার্ডের সরকার এলাকার পাঁচতলা ভবনের মালিক সফিকুল ইসলামও পেয়েছেন টিসিবির কার্ড, কার্ড পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক লুৎফা বেগম, পেয়েছেন নেকমরদ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক ও ওষুধ ব্যবসায়ী খালেদ মাহমুদও। এ ছাড়া কার্ড পেয়েছেন জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ারুল ইসলাম মনি।

পৌর শহরের ৫নং ওয়ার্ডে টিসিবির কার্ড পেয়েছেন চিনিকলের সাবেক কর্মকর্তা হজরত আলী, তার ছেলে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ডিজিএম পদের দায়িত্বে রয়েছেন এবং তার বহুতল ভবনও রয়েছে। পেয়েছেন অগ্রণী ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম, তার দোতলা ভবন রয়েছে। এ ছাড়াও পেয়েছেন প্রয়াত মজিবর রহমানের ছেলে রাসেল ও মেয়ে নীলা, তাদেরও পাকা একতলা ভবন রয়েছে। পৌর শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কাপড় ব্যবসায়ী মো. শাওনও পেয়েছেন টিসিবির কার্ড। এসব ব্যক্তি কার্ডের মাধ্যমে টিসিবির পণ্য কিনেছেন। কার্ড পেয়েছেন সদর উপজেলার গড়েয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আফিজার রহমান দুলাল। পৌর শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদের বড় ভাই আনসারুল হককে টিসিবির পণ্য কিনতে দেখা যায়। সে সময় শহরের নরেশ চৌহান সড়কের বাসিন্দা আলিম উদ্দীন বলেন, ‘আনসারুল হকের দোতলা বাড়ি, দোকান এবং গ্রামে জমিজমা আছে। তারপরও তিনি কীভাবে এই কার্ড পেলেন?’

গড়েয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আফিজার রহমান দুলাল বলেন, ‘এই কার্ড সচ্ছল ব্যক্তিরা পাবেন না, এমন কোনো নির্দেশনা নেই। তাই অন্যদের মতো আমিও নিয়েছি।’

জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ারা চৌধুরী বলেন, ‘আমি কারও কাছে কার্ড চাইনি। আমি কার্ড পাওয়ার যোগ্যও না। এর পরও আমার নামে কীভাবে এলো, বলতে পারছি না।’

শহরের বসিরপাড়া এলাকার ভ্যানচালক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি টিসিবির কার্ড পাইনি, যারা বহুতল ভবনের মালিক, যাদের জমিজায়গা আছে, যারা সচ্ছল, তারাই এই কার্ড পেয়েছে।’

ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুদাম সরকার বলেন, ‘খুব কম সময়ে তালিকা করতে হয়েছে, এ জন্য কিছু ভুল থেকে যেতে পারে।’

ঠাকুরগাঁও পৌরসভায় টিসিবির পণ্য বিক্রি কার্যক্রমের ‘ট্যাগ কর্মকর্তা’ রতন কুমার বলেন, ‘অনেক সচ্ছল ব্যক্তি কার্ড পেয়েছেন- এটা অস্বীকারের সুযোগ নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে।’

সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তাহের মোহাম্মদ সামসুজ্জামান বলেন, ‘সচ্ছল ব্যক্তিদের কার্ড দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নিজস্ব প্রতিবেদক (বগুড়া) জানান, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণে অনিয়ম এবং পণ্য বিক্রিতে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ উঠেছে। বগুড়া পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ড ও জেলার ১০৮টি ইউনিয়নে এসব পণ্য বিক্রির কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এ কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য না পেয়েই অনেককে চলে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিরা সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়ছেন।

সকাল ৯টা থেকে পণ্য বিক্রির কথা থাকলেও টিসিবির পণ্য নিয়ে ট্রাক আসছে কখনো দুপুর ১টা, কখনো বেলা ২টায়। ডিলাররা কখনো কখনো স্থান পরিবর্তন করছে। এতে ক্রেতাদের ট্রাকের পেছনে দৌড়াতে দেখা গেছে। অনেক বৃদ্ধ নারী-পুরুষ দৌড়াতে না পেরে বাধ্য হয়েই ফিরে যাচ্ছেন।

বগুড়া শহরের চকসূত্রাপুরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জহিরউদ্দিন, হাফিজা খাতুনসহ অনেকের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, তাদের ওয়ার্ডে কোনো টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়নি। একই অভিযোগ করেছেন ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ী ইউনিয়নের চিথুলিয়া গ্রামের ভুট্টো মিয়া, বাদশা মিয়া ও রব্বানী।

বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকার আব্দুল লতিফসহ কয়েকজন বলেন, সার্কিট হাউসের সামনে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু পণ্য শেষ হয়ে যাওয়া তারা পাননি।

মালতিনগর এলাকার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সার্কিট হাউসের কাছ থেকে সাতমাথায় গাড়ি চলে গেলে তিনি দৌড়ে সেখানে যান; কিন্তু গিয়েও পাননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শহরের কয়েক বাসিন্দা জানান, বগুড়া পৌর এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের টিসিবির কার্ড দেওয়া হয়েছে বেশি। কারণ মেয়র বিএনপির রাজনীতি করেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) জানান, করোনা মহামারীর শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রীর নগদ আড়াই হাজার টাকার উপহার পৌঁছে দিতে যে তালিকা হয়েছিল, সেই তালিকার সবাই এবং নতুন কিছু নাম সংযুক্ত করে টিসিবির সুবিধাভোগীর তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু আগের তালিকায় গলদ ছিল। সেই গলদ রয়ে গেছে এবারের তালিকায়ও।

নিজস্ব প্রতিবেদক (কুড়িগ্রাম) জানান, সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের মিলপাড়া এলাকার ভূমিহীন নামদেল আলীর স্ত্রী মিনু বেগম, সাবুল, সকিয়ত, ভুবেনসহ অনেকেই অভিযোগ করেন, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যান তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে গেছে, কিন্তু কার্ড দেয়নি। অন্যদিকে রৌমারীতে বেশি মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বৃহস্পতিবার রৌমারী বাজারের টিএনটি মোড়ে ‘মেসার্স এমএ মোমেন’ টিসিবির পণ্য বিক্রি করে। এতে সয়াবিন তেল লিটারে ১০০ টাকার স্থলে নেওয়া হচ্ছে ১১৫ টাকা, ৫৫ টাকার চিনি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। মসুর ডালের কেজিতে ৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৩০ টাকা, তিন কেজিতে নেওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা। এমএ মোমেন জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় রংপুর থেকে মালামাল আনতে পরিবহন খরচ বেশি পড়েছে। এ কারণে দাম একটু বেশি নেওয়া হচ্ছে।

নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, নিম্নআয়ের অনেক মানুষ অভিযোগ করেছেন, ফ্যামিলি কার্ড পেতে তাদের ব্যাপক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। কার্ড পেতে টাকাও দিতে হয়েছে দালালদের। আবার অনেক সচ্ছল পরিবারও কার্ড পেয়েছে।

সদরের খোকশাবাড়ী গ্রামের গোলাম মোস্তফা অভিযোগ করেন, ‘আমি একটি কার্ডের জন্য মেম্বারের কাছে অনেক দিন ঘুরেছি, কার্ড পাইনি। কিন্তু মেম্বারের দালাল রফিকুল ইসলাম আমাকে বলে যে ৩শ টাকা দিলে কার্ড মিলবে। তখন আমি ৩শ টাকা দিয়ে কার্ড পেয়েছি।’

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, টিবিসির উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে দুই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে। বংশিকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবুল কাশেম, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ আজাদ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সুজন মিয়া বলেন, তালিকা তৈরি করার বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। চেয়ারম্যান স্বজনপ্রীতি করে সব কিছু করছেন।

এদিকে ছাতকের দোলারবাজার ইউনিয়নে টিসিবির উপকারভোগী তালিকা তৈরিতে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। এই ইউনিয়নের তালিকাভুক্ত ১ হাজার ১৫৩ জনের মধ্যে প্রবাসী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও স্বাবলম্বী ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। তালিকায় চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের স্বজনদের নামও রয়েছে।

বরগুনা প্রতিনিধি জানান, টিসিবির পণ্য বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয় ও সমর্থনকারীরা পাচ্ছে এসব পণ্য। আবার টাকা না হলে মিলছে না টিসিবির কার্ড। অনেকের কাছ থেকে ১০০০ টাকাও চাচ্ছেন অনেক জনপ্রতিনিধি। ৫ নম্বর আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়নের দুই ইউপি সদস্য জলিল ও মোকলেস কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের কথা স্বীকার করেছেন।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামিয়া শারমিন বলেন, ‘এখনো কেউ আমার কাছে অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here