ব্যাংকে টাকা তোলার চাপ বাড়ছে তারল্য সংকট

0
150

মুরাদ হোসেন লিটন : রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে বাড়তি চাহিদায় নগদ টাকা তোলার চাপে ব্যাংকগুলোতে ফের তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তঃব্যাংক কলমানি বাজার। সপ্তাহের ব্যবধানে এ বাজারে গড় সুদ হার ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ উঠেছে। এমনকি এ বাড়তি সুদেও টাকা ধার পাচ্ছে না কিছু কিছু ব্যাংক, যারা সংকট সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত তিন দিনে সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি তারল্য সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মূলত করোনার অজুহাতে নিয়মিত ঋণের পাশাপাশি প্রণোদনার টাকা যথা সময়ে ফেরত না আসা, রেমিট্যান্স ও সুদ হারের পতনে আমানতের প্রবৃদ্ধি ব্যাপকহারে কমে যাওয়া, আমদানির চাপে ডলার কিনে এলসির দায় পরিশোধের কারণে বেশ কয়েকটি ব্যাংকে আগে থেকেই নগদ টাকার টানাটানি চলছিল। এর মধ্যেই রোজার কারণে বাড়তি কেনাকাটায় ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তোলার চাপ বেড়ে গেছে। এর ফলে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে নগদ টাকার সংকট আরও বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, রোজা ও ঈদের সময় নগদ টাকার বেশি চাহিদা হয়। এ সময় মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে খরচের জন্য তুলে নিয়ে যায়। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকও এ সময় বাজারে টাকার সার্কুলেশন কিছুটা বাড়িয়ে রাখে। তবে সব ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা একই রকম না হওয়ায় হঠাৎ টাকা তোলার প্রবণতা বাড়লে তারা সংকটে পড়ে যায়।

তখন সংকট কাটাতে প্রথমে ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক কলমানি থেকে টাকা ধারের চেষ্টা করে। সেখানে না পেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়।

নগদ অর্থের সংকট দেখা দিলে একদিনের জন্য এক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেয়, যা কলমানি বলে পরিচিত। ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তোলার চাপ বাড়ায় রোজা শুরুর আগেই এ বাজারে দেখা দেয় অস্থিরতা। গত ২৭ মার্চ এ বাজারে গড় সুদের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫১ শতাংশ। গত ৫ এপ্রিল তা সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৭০ শতাংশে ওঠে। এর মানে মাত্র ১ সপ্তাহের ব্যবধানে কলমানির সুদ বাড়ে প্রায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। তবে গতকাল এ বাজারে ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ সুদে লেনদেন হয়। তবে এ সুদেও টাকা পায়নি বেশ কয়েকটি ব্যাংক, যারা দৈনন্দিন লেনদেন কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ৩১ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র তিন কার্যদিবসে সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪ এপ্রিল ৭ ব্যাংকে ১ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা, ৩ এপ্রিল ৪টি ব্যাংকে ৯৭৭ কোটি টাকা এবং ৩১ মার্চ ৩টি ব্যাংকে ৯২৬ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মো. শামস-উল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, অগ্রণী ব্যাংকের নগদ টাকার কোনো সংকট নেই। তবে ব্যাংক খাতে নগদ টাকার যে সংকটের কথা বলা হচ্ছে, সেটাকে পুরোপুরি সংকট বলা ঠিক হবে না। আমি এটাকে বলব আকস্মিক ঝড়। মূলত অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরি হওয়ায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রোজার কারণে বাড়তি কেনাকাটার নগদ টাকা তোলা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এটা ঈদের আগেই অনেকটা কেটে যাবে। কারণ ঈদের আগে আমদানি ব্যয় আর খুব একটা বাড়বে বলে মনে হয় না, যা বাড়বে আগেই বেড়ে গেছে। এ ছাড়া আমাদের রেমিট্যান্স ও রপ্তানি ব্যয় বাড়ছে। ঈদের আগে রেমিট্যান্স আরও বাড়বে।

গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি বেশ গতিতে বাড়ছে। বাংলদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ। একই সময়ে নতুন এলসি খোলার ব্যয় বেড়েছে ৪৯ শতাংশ। খাদ্যপণ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য সবকিছুর আমদানি খরচই এখন ঊর্ধ্বমুখী। ব্যবসায়ীদের এলসি খোলার এ ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর ডলার কেনার পেছনে ব্যয় হয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা।

দেশে করোনা আঘাত আসার আগে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বার্ষিক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৮২ শতাংশ। সেই প্রবৃদ্ধি বাড়তে বাড়তে ২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ ওঠে। কিন্তু এর পর থেকেই টানা কমছে আমানতের প্রবৃদ্ধি। সর্বশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) হিসাবে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here