দুই হাজার টাকাতেও ‘না’ নেই এমপির

0
142

ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অসহায় মানুষের নামে বরাদ্দ দেওয়া দুই হাজার টাকাও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনের সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর বিরুদ্ধে। দৈনিক আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্যের অনুকূলে ঐচ্ছিক তহবিলে বরাদ্দ হওয়া টাকা তিনি বেশির ভাগই আত্মসাৎ করেছেন। এমনকি নিজের ব্যক্তিগত সহকারীর (পিও) নামেও বেশ কয়েকবার পাঁচ ও দশ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন তিনি। সেই টাকার বিষয়ে জানেন না তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাও।

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে দেওয়া পানির ট্যাংক বিতরণেও ঘটেছে অনিয়মের ঘটনা। সরকারিভাবে দেড় হাজার টাকার বিনিময়ে দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিটি ট্যাংক বাবদ নেওয়া হয়েছে পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা। নিজের শ্বশুরবাড়িতে দিয়েছেন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানির ট্যাংক।

২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর ঐচ্ছিক তহবিলে বরাদ্দকৃত টাকা বণ্টনের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিজের আত্মীয়-স্বজন, তুলনামূলক সচ্ছল, নিজের প্রতিষ্ঠিত কলেজের শিক্ষক, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে টাকা উত্তোলন করেছেন। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব টাকা আত্মসাৎ করেছেন নিজেই। অনেকে জানেনই না যে তাদের নামে ঐচ্ছিক তহবিল থেকে টাকা বরাদ্দ হয়েছিল।

দৈনিক আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাসান নামের এক ব্যক্তির নামে কয়েক দফা ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। হাসানের বাবার নাম বাবুল মিয়া। ঠিকানা সূর্যমনি, টিকিকাটা। ঠিকানা ধরে খোঁজ পাওয়া যায় হাসানের। জানা যায়, হাসান দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে। কিন্তু এই হাসানের নামেই ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা তোলা হয়েছে বেশ কয়েকবার।

এ বিষয়ে হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এমপি মহোদয়ের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে চার-পাঁচ বছর কাজ করছি। কিন্তু ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা নিইনি কখনো। এই টাকা সংসদ সদস্যই নিয়েছেন। আমি কেবল স্বাক্ষর করেছি।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘দীর্ঘদিন কাজ করলেও আমাকে বেতন দেওয়া হয়নি। বেতনের টাকা তুলে এমপি মহোদয়ের স্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হতো। চলাফেরার জন্য আমাকে মাত্র ৪ হাজার টাকা দেওয়া হতো।’

এ বিষয়ে ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা প্রাপ্ত অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা হয় আমাদের সময়ের প্রতিবেদকের। এর মধ্যে ১৬ জনই বলেছেন, তারা কোনো টাকা পাননি। এমনকি অনেকে জানেনই না তাদের নামে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রধানশিক্ষক মরিয়ম আক্তার। কাগজে-কলমে তিনি সংসদ সদস্যের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে ১০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। তবে আদতে তিনি টাকা হাতে পাননি। এ বিষয়ে ফোন করা হলে মরিয়ম আক্তার বলেন, ‘আমি এমপির কাছে ঐচ্ছিক তহবিলের টাকার জন্য কোনো আবেদনও করিনি। টাকাও তুলিনি।’

এমনই আরেকজন বাবুল মিয়ার মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকি। কাগজে-কলমে তার নামেও টাকা তোলা হয়েছে ১০ হাজার। তিনি বলেন, ‘আমি ওসব জানি না। আমি টাকা পাইনি। এমন কোনো তথ্যও জানি না।’ রোমানা নামের এক নারীও একই কথা বললেন।

তবে কয়েকজন জানিয়েছেন যে, তাদের সংসদ সদস্যের লোকজন দুই হাজার টাকা নিতে বলেছিলেন। কিন্তু তাদের নামে বরাদ্দ হওয়া ১০ হাজার টাকা চাইলে তা দিতে অস্বীকার করেন। পরে তারা ওই ২ হাজার টাকাও নেননি।

আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে বরাদ্দকৃতদের তালিকায় নাম রয়েছে বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্বজনদের। মঠবাড়িয়ায় নিজ নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজের শিক্ষকদেরও ঐচ্ছিক তহবিল থেকে টাকা দেওয়া হয়েছে। রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও আর্থিকভাবে সচ্ছল অনেক ব্যক্তির নামও। এমনই একজন আলী রেজা রঞ্জু। তালিকায় নাম লেখা কেবল রঞ্জু। তবে তালিকায় লেখা ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, এই আলী রেজা রঞ্জু সংসদ সদস্যের খুব নিকটজন; স্থানীয়রা তাকে চেনেন এমপির পিএ হিসেবে। স্থানীয় উন্নয়ন কাজ থেকে শুরু করে সংসদ সদস্যের হয়ে এলাকায় দেখভাল করেন তিনিই। তার নামেও টাকা তোলা হয়েছে বেশ কয়েকবার। এ বিষয়ে আলী রেজা রঞ্জুকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

সংসদ সদস্যের চাচাত ভাইয়ের ছেলে তুষখালি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাওলানা মাসুম, আরেক চাচাত ভাইয়ের ছেলে হাফেজ নাসির, কলেজ শিক্ষক বিপুল বিশ^াস, বাশার, ভাগনে মো. কামাল, মেয়ের গাড়িচালক মুশতাক, নিজ অফিস স্টাফ সোলায়মান, সাবেক পিএ মাসুম, ভাগ্নে জসিম, নাতি সম্পর্কিত মুসাসহ অন্তত কয়েকশ নিকটাত্মীয়ের নামে টাকা তোলা হয়েছে।

টাকা বরাদ্দের তালিকায় নাম রয়েছে নিজ নামে প্রতিষ্ঠিত ডা. রুস্তম আলী ফরাজী কলেজের অধ্যক্ষ এবং আ. ওহাব আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষের নাম। এছাড়াও তালিকায় নাম রয়েছে সংসদ সদস্যের সাবেক পিএ মাসুমেরও।

এসব বিষয়ে গত রবিবার মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঊর্মি ভৌমিককে ফোন করা হলে তিনি গাড়িতে আছেন জানিয়ে পরে ফোন করতে বলেন। তবে এরপর গতকাল দিনভর চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদেবার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি তার।

গত কয়েকদিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর সঙ্গে। তবে তিনি ফোন ধরেননি। রুস্তম আলী ফরাজী জাতীয় সংসদের পাবলিক একাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান। পাবলিক একাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. তিরান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী একটি মিটিংয়ে আছেন। মিটিং শেষ হলে কথা বলে প্রতিবেদককে জানাবেন। তবে এরপর আর কল করেননি। পরে গতকাল রাতে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করা হয় রুস্তম আলী ফরাজীর মোবাইল ফোনে। ঐচ্ছিক তহবিল বরাদ্দ নিয়ে অনিয়ম প্রসঙ্গে বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চেয়ে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here