ট্রেনে ব্যয় পৌনে তিন টাকা, আয় ৬২ পয়সা

0
81

রেলওয়েতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে সরকার। নেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন প্রকল্প। বর্তমানে ৪০টি প্রকল্প চলমান; কিন্তু লোকসান থেকে বের হতে পারছে না সংস্থাটি। অবশ্য লোকসান কমানোর চিন্তাও নেই। কর্মকর্তাদের যুক্তি- রেল রাষ্ট্রায়ত্ত সেবা খাত। লোকসান হলেও সমস্যা নেই। এমন মনোভাব পোষণের কারণে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের বিস্তর ফারাক দেখা দিয়েছে। ট্রেন পরিচালনায় যাত্রীপ্রতি কিলোমিটারে খরচ হয় ২ টাকা ৪৩ পয়সা আর আয় মাত্র ৬২ পয়সা।

গতকাল রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বৈঠকে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেনের প্রতি কিলোমিটার পরিচালনার খরচ তুলে ধরা হয়। এ হিসাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কিলোমিটারে যাত্রীপ্রতি খরচ পৌনে তিন টাকা এবং আয় ৬২ পয়সা দেখানো হয়েছে। একই অর্থবছরে পণ্য পরিবহনে কিলোমিটারে টনপ্রতি খরচ ৮ টাকা ৯৪ পয়সা এবং আয় ৩ টাকা ১৮ পয়সা।

রেলওয়ের কর্মকর্তা, রেল নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে রেলের এই দুরবস্থার পেছনে তিনটি বড় কারণ পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে- দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ। গত কয়েক বছরে রেলে যে পরিমাণ বিনিয়োগ ও প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের মতো দক্ষ কর্মকর্তার অভাব রয়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে- যাত্রীসুবিধা বা আয়বর্ধক প্রকল্প না নিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটার প্রকল্প নেওয়া। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিক, ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিস্বার্থ কাজ করে।

নিজস্ব ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি লিজে ট্রেন পরিচালনা করে রেলওয়ে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত ট্রেনগুলোর বাৎসরিক খরচ ও রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ জানতে চায় সংসদীয় কমিটি। এর জবাবে গতকাল রেলওয়ে জানিয়েছে, পূর্বাঞ্চলে ১৬টি ট্রেন চলে; আয় করে ৭৩ কোটি ৮৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা। পশ্চিমাঞ্চলে ২৪টি ট্রেনের মাধ্যমে আয় ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা। লিজ দেওয়া ৪০ ট্রেনের ব্যয় বেশি হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে সংসদীয় কমিটি।

গত তিন বছরে ট্রেনে ব্যবহৃত জ্বালানির তথ্যও জানতে চায় সংসদীয় কমিটি। সেখানে বলা হয়, প্রতিমাসে ৩৯ হাজার ৪৯ লিটার হিসাবে মোট ১৪ লাখ ৫ হাজার ৭৬৫ লিটার ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার হয়েছে। এ ছাড়া গ্রিজ ১২৭৭ কেজি হিসাবে ৪৫ হাজার ৯৮৮ কেজি লেগেছে। আর গিয়ার অয়েল/কুলেন্ট ব্যবহার হয়েছে প্রতিমাসে ৮০৯৩ লিটার। এ হিসাবে ৩ বছরে ২ লাখ ৯১ হাজার ৪০৩ লিটার ব্যবহার করেছে রেল। এ ছাড়া ১২৯ লিটার কম্প্রেসর অয়েল মাসিক হিসাবে তিন বছরে ৪ হাজার ৬৫৫ লিটার ব্যবহার হয়েছে। একইভাবে হাইড্রোলিক অয়েল বা নিউমেটিক কন্ট্রোল অয়েল মাসে ব্যবহার করেছে ৪৫৫ লিটার। তিন বছরে ব্যবহার হয়েছে ১৬ হাজার ৪০৯ লিটার।

সূত্রমতে, রেলে ব্যয় হয় দুই ধরনের। একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে, অন্যটি অনুন্নয়ন খাতে অর্থাৎ রেল পরিচালনায় দৈনন্দিন খরচ। উন্নয়ন বাজেটের অধীনে যে প্রকল্প শেষ হয়েছে এবং চলমান আছে এর বেশির ভাগই নতুন রেললাইন ও সেতু নির্মাণ, ইঞ্জিন-বগি কেনা, অবকাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত। অনুন্নয়ন খাতে বেশির ভাগ ব্যয় হয় রক্ষণাবেক্ষণ ও বেতন-ভাতায়।

পরিবহন বিশ্লেষকরা জানান, রেলকে বাঁচাতে হলে মালামাল পরিবহন বাড়াতেই হবে। এখন সব চাপ পড়ছে সড়কে। এভাবে সড়কে চাপ বাড়লে সড়কও ভেঙে পড়বে। তাই রেলে মালামাল পরিবহন বৃদ্ধির জন্য অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি কন্টেইনার কোম্পানি লিমিটেডকে (সিসিএল) শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের এমন কিছু নীতি-সুবিধা ঘোষণা করতে হবে, যাতে রেলে মালামাল পরিবহনে সবাই উৎসাহী হয়। আর যাত্রী পরিবহন বাড়ানোর একটাই পথ, তা হচ্ছে সেবা বৃদ্ধি। এ জন্য কিছু কিছু সেবা সরকারি-বেসরকারি যৌথ ব্যবস্থাপনার ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে এর সঙ্গে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করেছেন রেল কর্মকর্তারা। তারা মনে করেন, কেবল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলেই লাভ হবে না। সরকারি খাতে রেখে সংশ্লিষ্টদের আনতে হবে জবাবদিহিতার আওতায়। এখনো রেল কর্মকর্তারা লোকসান থেকে উত্তরণের জন্য চিন্তা করছেন না। তাদের মনোভাব পরিবর্তন ছাড়া লাভের মুখ দেখবে না রেল।

গতকাল সংসদীয় কমিটির এক সদস্যও রেলের এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন। তার মতে, প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনার পরও ব্যয় বেশি দেখানো হচ্ছে। তা হলে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে লাভ কী? এসব কথা হয়েছে গতকালের বৈঠকে।

এসব বিষয়ে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করলেও কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here